প্রযুক্তি বদলেছে, বদলায়নি অভ্যাস, আশি-নব্বইয়ের সেই আড্ডা এখনো বেঁচে আছে ফুলবাড়ীর গ্রামাঞ্চলে !
প্রযুক্তি বদলেছে, বদলায়নি অভ্যাস, আশি-নব্বইয়ের সেই আড্ডা এখনো বেঁচে আছে ফুলবাড়ীর গ্রামাঞ্চলে !
অনিল চন্দ্র রায়, ধরলা পোস্ট : ২ অক্টোবর ২০২৬
দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে আশি কিংবা নব্বই দশকের কোনো ছবি। কিন্তু এটি ২০২৬ সালের অক্টোবরের দৃশ্য। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটের এই যুগেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর প্রত্যন্ত গ্রামে টেলিভিশন ঘিরে আড্ডা ও বিনোদনের সেই পুরোনো সংস্কৃতি এখনো টিকে আছে।
ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পূর্বফুলমতি গ্রামের একটি পাড়ার দোকানে গিয়ে দেখা গেল এমনই চিত্র। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই দোকানে জড়ো হয়েছেন ১০ থেকে ১২ জন মানুষ। কেউ মনোযোগ দিয়ে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখছেন, আবার কেউ অনুষ্ঠান দেখার পাশাপাশি গল্প-গুজবে মেতে উঠেছেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলছে হাসি-আড্ডা আর নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় অনেকেই বাড়ির পাশের ছোরাফ আলীর দোকানে এসে জড়ো হন। সেখানে চা-বিস্কুট খাওয়ার পাশাপাশি টেলিভিশনে সিনেমা, নাটক, খবর কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখেন। রাত ৮টা থেকে কখনো কখনো রাত ৯টা পর্যন্ত চলে এই আড্ডা।
পূর্বফুলমতি গ্রামের কৃষক গোলাম রব্বানী (৬৫) ও হযরত আলী (৬০) বলেন, “মোবাইল ফোন আছে, তবে ছেলে ও নাতিরাই বেশি ব্যবহার করে। মোবাইলে কোনো অনুষ্ঠান দেখলে আমাদের তেমন তৃপ্তি হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে ১০ থেকে ১২ জন একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখি। দেখার ফাঁকে গল্প করি, একে অন্যের সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করি। এতে ভালো লাগে।”
বালাতাড়ি এলাকার কাসেম আলী (৫৮) বলেন, “বাড়িতে টেলিভিশন থাকলেও একা একা বসে দেখার চেয়ে দোকানে এসে সবার সঙ্গে বসে দেখা অনেক বেশি আনন্দের। এখানে পরিচিত মানুষজন থাকেন। খেলা, সিনেমা, নাটক কিংবা খবর দেখার পাশাপাশি নানা বিষয় নিয়েও কথা হয়।”
একই এলাকার ইব্রাহিম (৬০) বলেন, “আগে গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশন দেখতেন। এখন সবার হাতে মোবাইল ফোন। তারপরও আমাদের মতো বয়স্কদের কাছে একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখা ও গল্প করার আনন্দটা আলাদা।”
কুরুষাফেরুষা এলাকার হযরত আলী (৫০) বলেন, “মোবাইল ফোনে সবাই নিজের নিজের মতো ব্যস্ত থাকে। কিন্তু টেলিভিশন দেখতে বসলে একসঙ্গে কয়েকজন থাকা যায়। একটা অনুষ্ঠান নিয়ে সবাই মিলে আলোচনা করা যায়। তাই সুযোগ পেলেই চায়ের দোকানে এসে বসি।”
পূর্বফুলমতি গ্রামের চা-বিস্কুট বিক্রেতা ছোরাফ আলী (৫৩) জানান, তিনি প্রতিদিন সকাল ৬টায় দোকান খোলেন এবং রাত ১০টার দিকে বন্ধ করেন। সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত আশপাশের লোকজন চা-বিস্কুট খাওয়ার পাশাপাশি টেলিভিশন দেখেন। দুপুরে বেচাকেনা থাকলেও লোকসমাগম তুলনামূলক কম থাকে। বিকেল ৫টার পর আবার বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। সন্ধ্যার পর দোকানটি প্রায় ভরে যায়।
তিনি বলেন, “বেশির ভাগই গ্রামের প্রবীণ ও মধ্যবয়সী মানুষ। চা-বিস্কুট খাওয়ার ফাঁকে গল্প করেন, আবার আনন্দের সঙ্গে টেলিভিশনে সিনেমা-নাটক দেখেন।”
ছোরাফ আলী জানান, তাঁর দোকানে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বিক্রি হয়। সংসারের কাজের ফাঁকে দোকান চালিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে। তবে মানুষের আড্ডা আর টেলিভিশন দেখার এই পরিবেশই তাঁর দোকানের আলাদা একটি পরিচয় হয়ে উঠেছে।
ফুলবাড়ীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম বলেন, “একসময় প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় সন্ধ্যার পর ২০ থেকে ৩০ জন মানুষ একসঙ্গে বসে গল্প-গুজব ও আড্ডায় সময় কাটাতেন। রাত ৮টা বাজলেই দলবেঁধে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে কারও বাড়িতে গিয়ে সাদা-কালো টেলিভিশনে ‘ইত্যাদি’, ‘আলিফ লায়লা’সহ জনপ্রিয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। টেলিভিশন দেখাকে ঘিরে তখন বেশ জমজমাট আড্ডা হতো।”
তিনি বলেন, “এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই টেলিভিশনের পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সুবিধা থাকায় আগের সেই সম্মিলিত আড্ডার সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে প্রত্যন্ত এলাকার কিছু পাড়া-মহল্লায় এখনো কয়েকজন প্রবীণ মানুষ একসঙ্গে বসে গল্প-গুজবের পাশাপাশি পাড়ার দোকানে টেলিভিশন দেখে সময় কাটান।”
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, “বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন থাকায় গ্রামগঞ্জে আগের মতো আড্ডা বসা কিংবা পাড়া-মহল্লার ছোট হাট-বাজারের দোকানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে টেলিভিশন দেখার দৃশ্য অনেকটাই বিরল হয়ে গেছে। তবে এখনো কিছু কিছু এলাকায় এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা এখনো এই আধুনিক যুগেও আশি-নব্বই দশকের সেই অভ্যাস ধরে রেখেছেন, তাদের অধিকাংশই গ্রামের কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষ। মোবাইল ফোনে ব্যস্ত না থেকে তারা একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখছেন—এটিও এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। পুরোনো সেই অভ্যাস ধরে রাখার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।”
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের বিনোদনের ধরন বদলে গেলেও ফুলবাড়ীর প্রত্যন্ত গ্রামের এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়—স্মার্টফোনের যুগেও একসঙ্গে বসে গল্প করা, হাসি-আড্ডা আর টেলিভিশন দেখার আনন্দ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।