অনিল চন্দ্র রায়, ধরলা পোস্ট: ৫ অক্টোবর ২০২৬
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কটি বেশ ব্যস্ত। রকমারি বৃক্ষরাজিতে ঘেরা আঁকাবাঁকা এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে অসংখ্য মানুষ ও যানবাহন। তবে ইদানীং এ পথে চলতে গিয়ে অনেক পথচারীর চোখ আটকে যাচ্ছে গাছের গায়ে টাঙানো ছোট ছোট প্ল্যাকার্ডে। কেউ কেউ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। কারণ, এসব প্ল্যাকার্ডে লেখা রয়েছে সমাজ ও পরিবেশ সচেতনতামূলক নানা বার্তা।
কোনো প্ল্যাকার্ডে লেখা— ‘অকারণে গাছ কাটব না’, ‘পাখি আমাদের বন্ধু’, ‘পাখিদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ি’। কোথাও আবার— ‘মোড়ে গতি কমান, জীবন বাঁচান’, ‘অযথা হর্ন বাজাবেন না’, ‘পানিতে ময়লা ফেলবেন না’। আরও রয়েছে— ‘মাদকসেবন জীবন ধ্বংস করে, মাদককে না বলি’, ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ এবং ‘সদা সত্য কথা বলি’—এর মতো নানা সচেতনতামূলক বার্তা।
তবে এ উদ্যোগের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—কোনো বড় সামাজিক সংগঠন কিংবা সমাজকর্মী নয়, এসব প্ল্যাকার্ড তৈরি ও টাঙানোর কাজটি করছে মাত্র ১০ বছরের এক শিশু।
শিশুটির নাম মেসবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। সে ফুলবাড়ী উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের স্কুলশিক্ষক সুজাউদ্দৌলা ও গৃহিণী মমতা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে এবং উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বাড়িতে পড়ে থাকা পুরোনো কার্টন ও নিজের খাতার পাতা দিয়ে মুগ্ধ তৈরি করছে এসব প্ল্যাকার্ড। নিজের হাতে লিখছে ছোট ছোট নীতিবাক্য ও সচেতনতামূলক বার্তা। এরপর বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে সুতা দিয়ে সেগুলো টাঙিয়ে দিচ্ছে। মুগ্ধের এমন উদ্যোগ দেখে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা যেমন অবাক হচ্ছেন, তেমনি তাকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।
পথচারী ওবায়দুল হক বলেন, ‘আমি এ পথে নিয়মিত যাতায়াত করি। হঠাৎ দেখি রাস্তার মোড় ও পাশের গাছে প্ল্যাকার্ড টাঙানো। তাতে সচেতনতামূলক নানা কথা লেখা। পরে জানতে পারি, মাত্র ১০ বছরের একটি শিশু এগুলো করেছে। বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো। তবে তার উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ।’
ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুটি যে কাজটি করছে, তা থেকে আমাদের বড়দেরও শিক্ষা নেওয়া উচিত। সমাজ ও পরিবেশ রক্ষায় আমরা যদি এগিয়ে আসি, সেটিই হবে তার জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।’
মুগ্ধের সহপাঠীরা জানায়, মুগ্ধ বাড়িতে বসে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে। বিকেলে তাদের ডেকে নেয়। কেউ মই, কেউ সুতা নিয়ে তার বাড়িতে যায়। এরপর সবাই মিলে গাছে গাছে প্ল্যাকার্ড টাঙিয়ে দেয়। এসব প্ল্যাকার্ড মানুষ দেখছে—এতে তারাও আনন্দিত।
মুগ্ধ জানায়, ‘আমাদের হেডস্যার ক্লাসে কীভাবে প্ল্যাকার্ড তৈরি করতে হয়, তা শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শুধু শিখলেই হবে না, এগুলো বাস্তব জীবনেও কাজে লাগাতে হবে। স্যারের কথা মাথায় রেখে বাড়িতে থাকা পুরোনো কার্টন পরিষ্কার করি। খাতার পাতা ছিঁড়ে আঠা দিয়ে কার্টনে লাগিয়ে প্ল্যাকার্ড বানাই। বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে গাছে গাছে সেগুলো টাঙিয়ে দিই।’
মুগ্ধ আরও বলে, ‘আমার এলাকায় অনেকেই মাদক সেবন করে। আবার অনেক মানুষ পরিবেশের বিষয়ে সচেতন নয়। আমার লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে যদি একজন মানুষও মাদক ছেড়ে দেয়, একজন মানুষও যদি পরিবেশের কথা ভাবে, তাহলেই আমি নিজেকে সার্থক মনে করব। ভবিষ্যতেও আমি এ ধরনের কাজ করে যেতে চাই।’
মুগ্ধের বাবা শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজাউদ্দৌলা বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে এমন কাজ করছে, তা আমি আগে জানতাম না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি গাছে গাছে প্ল্যাকার্ড টাঙানো। পরে জানতে পারি, এগুলো আমার ছেলেই করেছে। তার এমন কাজ দেখে আমি অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। তাকে বুকে জড়িয়ে আদর করেছি এবং এ কাজে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছি। আমি চাই, বড় হলেও তার মধ্যে যেন এমন চিন্তা ও চেতনা অটুট থাকে।’
মুগ্ধের স্কুলের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী বলেন, ‘আমরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ড তৈরি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে শিখিয়েছি। এরই ধারাবাহিকতায় মুগ্ধ ছোট ছোট নীতিবাক্য লিখে গাছে গাছে প্ল্যাকার্ড টাঙিয়েছে। তার এমন উদ্যোগে অনেকেই প্রশংসা করছেন। আমি বিশ্বাস করি, মুগ্ধের এই কাজ অন্য শিক্ষার্থীদেরও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করবে।’
মুগ্ধের স্বপ্ন—সড়কে দুর্ঘটনা কমবে, চারপাশ থাকবে ছায়া-সুনিবিড়। গাছে গাছে পাখিরা ডাকবে, নির্মল আকাশে উড়বে। নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি থাকবে দূষণমুক্ত। কোনো পরিবারে থাকবে না মাদকাসক্তির ছায়া।
পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ মিয়া বলেন, ‘শিশুদের এমন সৃজনশীল ও জনকল্যাণমূলক কাজে পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুপ্রেরণা প্রয়োজন। মুগ্ধের মতো আমাদের আগামী প্রজন্ম জ্ঞান, মেধা ও মানবিক চেতনা দিয়ে সমাজ তথা দেশকে বদলে দেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’