আদিতমারী (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে গৃহবধূ আমেনা বেগমকে নির্যাতন ও যৌনাঙ্গে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর অভিযোগে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। অবরোধের কারণে কিছু সময়ের জন্য সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকল সাড়ে ১১টার দিকে লালমনিরহাট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে খাতাপাড়া বাজার এলাকার বাসিন্দাদের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে নিহত আমেনা বেগমের স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন আন্দোলনকারী সড়কের ওপর শুয়ে পড়ে প্রতিবাদ জানান। পরে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আমেনা বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
এক পর্যায়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি রওশন কবিরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া হলে আন্দোলনকারীরা অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর আদিতমারীর বড় কমলাবাড়ী এলাকার আফজাল হোসেনের সঙ্গে আমেনা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় স্বর্ণালংকার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকি আড়াই লাখ টাকার জন্য আমেনাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালের ২ মার্চ রাতে যৌতুকের টাকা দাবি করে স্বামী আফজাল হোসেন আমেনার পরনের কাপড় তুলে তাঁর যৌনাঙ্গে এসিড নিক্ষেপ করেন। এ সময় শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যরাও তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২১ আগস্ট সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আমেনা বেগমের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় আমেনার ভাই জাকির হোসেন আদিতমারী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন, আফজাল হোসেন, তাঁর বাবা মুসা মিয়া, মা আছিয়া বেগম, ভাই আনোয়ারুল হক ও মাহফুজা খাতুন। এর আগে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা বিচারাধীন ছিল। আমেনার মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। জামিন নিয়ে বাদীপক্ষের অভিযোগ। মামলার রিমান্ড ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে বাদীপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। বাদী মো. জাকির হোসেন অভিযোগ করেন, আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে এবং আদালত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশ করে জামিন নিয়েছেন।
এ ছাড়া মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে অনিয়ম, আসামিদের জামিনে সহযোগিতা এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কে এম হুমায়ুন রেজা স্বপনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন জাকির হোসেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পিপি অ্যাডভোকেট কে এম হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, “নারী ও শিশু আদালত আমার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আসামিপক্ষ সম্পূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জজকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে। এ বিষয়ের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।