DharlaPost কৃষি ডেস্ক:
বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কোনো রকম যত্ন বা পরিচর্যা ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে তালগাছ। পরিত্যক্ত জমি, রাস্তার পাশ, জমির আইল কিংবা পুকুরপাড়ে বেড়ে ওঠা এই গাছটি যেমন দীর্ঘ খরা ও জলাদ্ধতা সহ্য করতে পারে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বাণিজ্যিকভাবে তালের পরিকল্পিত চাষাবাদ না হলেও সঠিক নিয়মে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে সহজেই গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
রস সংগ্রহের উপযুক্ত গাছ ও কৌশল:
সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বয়সের সুস্থ-সবল তালগাছ রস সংগ্রহের জন্য উপযোগী। পুরুষ ও স্ত্রী উভয় গাছ থেকেই রস পাওয়া গেলেও দুই প্রজাতির গাছে রস আহরণের প্রক্রিয়া ভিন্ন:
পুরুষ গাছ: মার্চের শেষ সপ্তাহে (চৈত্রের ২য় সপ্তাহে) পুরুষ তালের পুষ্পমঞ্জরি বের হয়। প্রথম ৩ দিন সকাল-বিকেল আলতোভাবে পুষ্পমঞ্জরি চাপ দিয়ে নরম করতে হয়। মঞ্জরি একটু শক্ত হলে দুই পাশে বাঁশের বাতা দিয়ে হালকাভাবে টেনে নিতে হয়। এরপর ধারালো দা দিয়ে শেষ প্রান্ত সোজা করে কেটে নিচে মাটির পাত্র বা হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। একটি পুরুষ গাছে ৪-৫টি পুষ্পমঞ্জরি রেখে ৬-৭টি হাঁড়ি লাগানো যায়, যা থেকে দিনে ২৫-৩০ লিটার পর্যন্ত রস পাওয়া সম্ভব। মার্চ থেকে মধ্য জুলাই (আষাঢ়) পর্যন্ত রস পাওয়া যায়।
স্ত্রী গাছ: মে মাসে ফলের মঞ্জরিদণ্ড বের হলে ধারালো দা দিয়ে কাটা অংশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় মিষ্টি রস ঝরতে শুরু করে।
রস পরিষ্কার ও গুণগত মান ভালো রাখতে প্রতিদিন সকাল ৬টা, দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৬টায় মোট ৩ বার রস সংগ্রহ করা উচিত। রস সংগ্রহের সময় হাঁড়ি ও কাটা অংশ সুতি কাপড় বা পাটের চট দিয়ে ঢেকে রাখা জরুরি।
স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তালের গুড় তৈরির নিয়ম:
গুণগত মানসম্পন্ন তালের গুড় তৈরি করতে রস ছেঁকে কড়াইতে বসানোর পর থেকেই বিশেষ যত্ন নিতে হয়:
১. গাদ পরিষ্কার করা: কড়াই চুলায় বসিয়ে রস জ্বাল দেওয়ার সময় উপরিভাগে যে ফেনা বা গাদ ওঠে, তা শুরুতেই ছাঁকনি দিয়ে তুলে ফেলতে হবে। দেরি হলে এই গাদ রসের সঙ্গে মিশে গুড়ের মান নষ্ট করে দেয়।
২. অনবরত নাড়া ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: রস ঘনীভূত হয়ে সিরাপের মতো হলে হাতল দিয়ে অনবরত নাড়তে হবে এবং দ্রুত চুলার আঁচ কমিয়ে আনতে হবে।
৩. গুড় নামানোর সঠিক সময় পরখ: এক চিমটি ফুটন্ত গুড় ২০০ মিলি ঠান্ডা পানিতে ছেড়ে দিলে তা যদি সঙ্গে সঙ্গে জমাট বাঁধে, তবে বুঝতে হবে গুড় চুলা থেকে নামানোর উপযুক্ত হয়েছে।
অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় তালের ভূমিকা:
তালের চারা উৎপাদন, রস আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গুড় বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন বহু বেকার মানুষ। ফলে এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চল এবং বরেন্দ্র এলাকার পরিবেশ রক্ষায় এক অনন্য ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।