লিলি রানীর বঞ্চনা শুধু একজন নারীর নয়, এটি বৈষম্য, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কঠিন প্রশ্ন।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান করে না, ন্যায়, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষাও দেয়। সেই প্রতিষ্ঠানেই যদি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শ্রম দেওয়া একজন নারী স্থায়ী নিয়োগের সময় বঞ্চিত হন, আর তাঁর জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কী শিক্ষা দিচ্ছে? গাইবান্ধার দাড়িয়াপুর কলেজে হরিজন সম্প্রদায়ের লিলি রানীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ আমাদের সামনে এমনই একটি গুরুতর প্রশ্ন হাজির করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, লিলি রানী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কলেজের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন নামমাত্র পারিশ্রমিক, কখনো বা প্রায় বিনা বেতনে কাজ করেছেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও আনুগত্যের স্বীকৃতি মিলবে স্থায়ী নিয়োগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু নিয়োগের সময় তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে রয়েছে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগটি সত্য হলে এটি কেবল একজন শ্রমজীবী নারীকে বঞ্চিত করার ঘটনা নয়; এটি নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
প্রশ্ন হলো, ১৫ বছরের শ্রমের মূল্য কী? একজন মানুষ বছরের পর বছর একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করবেন, নিজের শ্রম ও সময় ব্যয় করবেন, অথচ প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর অভিজ্ঞতা ও অবদানের কোনো মূল্য থাকবে না? নিয়োগের সুযোগ কি কেবল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ, অর্থের লেনদেন কিংবা ক্ষমতার দাপটের ওপর নির্ভর করবে? যদি তা-ই হয়, তাহলে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও ন্যায্যতার কথা বলে লাভ কী?
শ্রমিকের শ্রম নেবেন, কিন্তু তাঁর অধিকার দেবেন না, এই দ্বিচারিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
লিলি রানীর ঘটনাটি আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি হরিজন সম্প্রদায়ের একজন নারী। বাংলাদেশের এই জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচ্ছন্নতাকাজের মতো শ্রমনির্ভর পেশায় নিয়োজিত। সামাজিক বৈষম্য, পেশাগত সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তাঁদের অনেকের সামনে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এমন বাস্তবতায় একজন নারী যখন দেড় দশক ধরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেবা করেন, তখন তাঁর প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
তবে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ বলে লিলি রানী কোনো বিশেষ অনুগ্রহের দাবিদার নন। তিনি দাবি করতে পারেন তাঁর শ্রমের স্বীকৃতি, ন্যায্য অধিকার ও বৈষম্যহীন আচরণ। তাঁর সম্প্রদায় পরিচয় যেন তাঁর অগ্রগতির পথে বাধা না হয়, আবার সেই পরিচয়কে ব্যবহার করে তাঁকে করুণার পাত্রও বানানো না হয়। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো, তাঁকে একজন নাগরিক ও শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে তাঁর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। দীর্ঘদিন কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেই আইনগতভাবে স্থায়ী নিয়োগের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় না। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান, অনুমোদিত পদ, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতার শর্ত এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু সেই বিধিবিধানের আড়ালে যদি অনিয়ম, পক্ষপাত কিংবা ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিয়মের দোহাই দিয়ে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। আবার আবেগের ভিত্তিতেও কাউকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি তোলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে। কোনো পক্ষকেই প্রভাব, পরিচয় কিংবা ক্ষমতার কারণে জবাবদিহির বাইরে রাখা চলবে না।
এখন প্রশ্ন, এই পরিস্থিতির সমাধান কী? প্রথমত, দাড়িয়াপুর কলেজের পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনকারীদের যোগ্যতা, নির্বাচনী কমিটির কার্যক্রম, নিয়োগের সিদ্ধান্ত, অনুমোদিত পদের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করতে হবে। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্তের দায়িত্ব এমন কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে, যাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, লিলি রানীর দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্মজীবনের বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। তিনি কোন শর্তে কাজ করেছেন, তাঁকে কী ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তাঁর কাজের বিনিময়ে কী পরিমাণ পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর নিয়োগসংক্রান্ত কোনো লিখিত বা প্রাতিষ্ঠানিক নথি রয়েছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। তাঁর কাজের স্বীকৃতি, বকেয়া পারিশ্রমিক কিংবা অন্য কোনো আইনগত পাওনা থাকলে তা নির্ধারণ করে আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর আইনগত যোগ্যতা ও প্রাপ্যতা যাচাই করে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষা প্রশাসনকে শুধু একটি অভিযোগের তদন্ত করেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়োগের শর্ত, নির্বাচনের মানদণ্ড ও ফলাফল যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং প্রযোজ্য নিয়মে প্রকাশ করতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে কোনো কর্মচারী বা আবেদনকারী প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
চতুর্থত, বছরের পর বছর অস্থায়ীভাবে বা অনিশ্চিত শর্তে কাজ করিয়ে কর্মীদের ভবিষ্যৎ ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘদিন একজনের শ্রমের ওপর নির্ভর করে, তাহলে তাঁর কর্মপরিস্থিতি, পারিশ্রমিক ও অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। মৌখিক আশ্বাস দিয়ে কাউকে বছরের পর বছর অপেক্ষায় রাখা কোনো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাজ হতে পারে না। শ্রম নেওয়ার সময় কর্মীকে প্রয়োজন হবে, আর অধিকার দেওয়ার সময় তাঁকে অচেনা মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, এমন সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।
সবশেষে, লিলি রানীর ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন একটি নিয়োগবিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং শ্রমের মর্যাদা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্ন পরিবেশের পেছনে তাঁর শ্রম রয়েছে। সেই শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব।
আমরা চাই না, কেবল হরিজন সম্প্রদায়ের একজন নারী বলে লিলি রানী বাড়তি সুবিধা পান। আমরা চাই, তিনি যেন তাঁর পরিচয়, দারিদ্র্য কিংবা অসহায়ত্বের কারণে কোনো ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন। আমরা চাই না, প্রমাণের আগেই কাউকে দুর্নীতিবাজ ঘোষণা করা হোক। আমরা চাই, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং প্রমাণিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হোক।
দাড়িয়াপুর কলেজ কর্তৃপক্ষের উচিত, অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় নথি প্রকাশ করা। শিক্ষা প্রশাসনেরও উচিত দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরা। কারণ নীরবতা সন্দেহ বাড়ায়, আর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে।
১৫ বছরের শ্রমকে অবহেলা করে যদি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সেটি শুধু একটি পদে অনিয়ম নয়; এটি ন্যায়বিচারের ধারণার ওপর সরাসরি আঘাত। আর যদি কোনো অনিয়ম না ঘটে থাকে, তাহলে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমেই সেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক।
লিলি রানীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হোক। নিয়োগে দুর্নীতি হয়ে থাকলে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হোক। আর কোনো শ্রমজীবী মানুষকে যেন বছরের পর বছর আশ্বাসের ওপর ভর করে কাজ করার পর শেষ মুহূর্তে শূন্য হাতে ফিরতে না হয়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কারণ একটি সভ্য সমাজে মানুষের শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা ন্যায্যতা ও বিধিবিধানের ভিত্তিতে, টাকার জোরে নয়। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি ন্যায়বিচারই উপেক্ষিত হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা কী নৈতিক শিক্ষা পাবে, এই প্রশ্নের উত্তর কলেজ কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
লেখক: নুরনবী মিয়া
সংগঠক ও গণমাধ্যমকর্মী
কুড়িগ্রাম।