অনিল চন্দ্র রায়, ধরলা পোস্ট অনলাইন মাল্টিমিডিয়া :
দেশের একমাত্র প্রস্তাবিত কুড়িগ্রাম বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাব্য এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খনিজ সম্পদ গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটি ঘিরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অবস্থান নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থার বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়ন প্রকল্পের কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা এবং কার্যকর উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর বালুতে ইলমেনাইট, জিরকন, ম্যাগনেটাইট, রুটাইল, গারনেট, মোনাজাইট ও কোয়ার্টজের মতো খনিজ থাকতে পারে। এসব খনিজের বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার রয়েছে। ইলমেনাইট ও রুটাইল থেকে টাইটানিয়ামজাত উপাদান উৎপাদন করা হয়, যা রং, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়। জিরকন সিরামিকসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়। ম্যাগনেটাইট ইস্পাতশিল্পে এবং গারনেট শিল্পকারখানায় কাটিং ও পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, কোয়ার্টজ ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ১১ জুন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) মোখলেসুর রহমান মিলনায়তনে ‘বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনার ধারণা তুলে ধরা হয়। এর লক্ষ্য যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদব্যবস্থার বালুসম্পদ কাজে লাগিয়ে খনিজ গবেষণা, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করা।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটির জমির উপযোগিতা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব প্রতিষ্ঠা, বিরল মৃত্তিকা মৌল বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস নিয়ে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, স্কাডা ও স্মার্ট মাইনিং প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং একটি জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া নিউক্লিয়ার-গ্রেড জিরকন ও উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের উপস্থাপনায় প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি টাইটানিয়াম, জিরকোনিয়াম ও রেয়ার আর্থভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং খনিজসম্পদকে কেন্দ্র করে একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের এসব হিসাব বাস্তবায়নের আগে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের গত ১৯ জুলাইয়ের একটি সভার কার্যবিবরণীকে কেন্দ্র করে। সভার ১০ নম্বর আলোচ্য বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না।
তবে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন বলছে, এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি। ফলে জেলা প্রশাসনের নামে উল্লেখ করা ওই অভিমতের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা গত বছরের ৫ মার্চ প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য-উপাত্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাবনাময় এ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জেলার মানুষের দাবি, বিষয়টি দ্রুত পরিষ্কার করে প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “সম্ভাবনাময় প্রকল্পটি এখনো শুরুই হয়নি। সেখানে কীভাবে কর্তৃপক্ষ বলতে পারে, এতে লাভ হবে না বা লোকসান হবে? সরকার দেশে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করছে। গবেষণার ভিত্তিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু কুড়িগ্রাম নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। আমরা আশা করি, সরকার প্রকল্পটি শুরুর জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।”
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খনিজসম্পদ আহরণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় মূল্যবান ও বিরল খনিজসম্পদ থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পের জন্য জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “আমি যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সভার ১০ নম্বর আলোচ্য বিষয়ে জেলা প্রশাসকের যে অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ধরনের কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, হিমালয় থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বালু কুড়িগ্রাম হয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীতে আসে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর বালুতে হেভি মিনারেল ও লাইট মিনারেল রয়েছে। হেভি মিনারেলের মধ্যে রুটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, জিরকন ও মোনাজাইটের মতো মূল্যবান খনিজ এবং লাইট মিনারেলের মধ্যে কোয়ার্টজ রয়েছে। এসব খনিজ আলাদা করে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাত করার লক্ষ্যেই তাঁরা কাজ করছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বালু গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে তা নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।