অনিল চন্দ্র রায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে ফিরে :
দেশ-বিদেশের লাখো ভক্তের পদচারণা, হরিনাম সংকীর্তন, ভজন, আরতি ও প্রার্থনায় মুখরিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মাপাড়ের ঐতিহাসিক খেতুরীধাম।
সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের মহান সাধক শ্রীশ্রী ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক মহোৎসব শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। মহোৎসবকে ঘিরে খেতুরীধাম পরিণত হয়েছিল ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী ও দর্শনার্থীদের এক বিশাল মিলনমেলায়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অধিবাস ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ মহোৎসব। বাংলা কার্তিক মাসের প্রথম তিন দিন ধরে চলে নানা ধর্মীয় আয়োজন। পদ্মাপাড়ের এই তীর্থভূমিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য ভক্ত। তাঁদের পদচারণা, হরিনাম সংকীর্তন ও ভক্তিমূলক আয়োজনে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রেমতলী এলাকা।
শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এ মহোৎসবকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন আগে থেকেই খেতুরীধামে ভক্তদের সমাগম শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাস, মাইক্রোবাস, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে ভক্তদের আগমন বাড়তে থাকে। অনেকে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করেন।
মন্দির প্রাঙ্গণ ছাড়াও সংযোগ সড়কের দুই পাশে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। সেখানে ধর্মীয় উপকরণ, পোশাক, খাবার, গৃহস্থালি সামগ্রী, কারুশিল্প এবং কামার-কুমারদের তৈরি মৃৎ ও লৌহজাত পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। ভক্ত-দর্শনার্থীদের ভিড়ে জমে ওঠে মেলা। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা দেয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা থেকে ঠাকুর নরোত্তম দাস রচিত ভজন-কীর্তন, সন্ধ্যা আরতি, দামোদর আরতি, নরোত্তম চরিতকথা ও অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনে ভোর থেকে মঙ্গল আরতি, হরিনাম সংকীর্তন, খেতুরীধাম পরিক্রমা, দর্শন আরতি ও শ্রীল প্রভুপাদ গুরুপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি চলে অষ্টপ্রহরব্যাপী তারকব্রহ্মনাম সংকীর্তন। এসব আয়োজনে অংশ নেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভক্তরা।
এদিনও সকাল থেকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, এর আগে নামসংকীর্তন, প্রার্থনা ও গঙ্গাস্নানে অংশ নেন ভক্তরা। দিনভর ভক্তদের পদচারণায় মুখর থাকে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) ছিল মহোৎসবের শেষ দিন। এদিন রাতে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ ঐতিহাসিক মহোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
খেতুরীধামের মহোৎসব শুধু ধর্মীয় আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনক্ষেত্র। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে উৎসবটি পেয়েছে ভিন্নমাত্রা।
খেতুরীধাম গৌরাঙ্গদেব ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এ মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও সম্প্রীতির টানে এখানে আসেন। ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় এবারও সুন্দরভাবে উৎসব সম্পন্ন হয়েছে।
গৌরাঙ্গবাড়ি মন্দিরের ব্যবস্থাপক গোবিন্দ চন্দ্র পাল জানান, উৎসবে আগত বিপুলসংখ্যক ভক্তের জন্য প্রসাদ, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভক্তদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রেমতলী বাজার থেকে খেতুরীধাম পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সংযোগ সড়কে আলোকসজ্জা করা হয়। পাশাপাশি আগত ভক্তদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে মেডিকেল টিম ও অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সব মিলে শান্তি পূর্ণ পরিবেশ উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
গোদাগাড়ী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সুজন মিয়া বলেন, গৌরাঙ্গবাড়ি ও খেতুরীধামের মহোৎসব উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আগত ভক্ত-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এ উপলক্ষে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৬০২ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁদের সতর্ক অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইসরাত জাহান জানান, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে মহোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।
ঠাকুর নরোত্তম দাসের জীবন ও খেতুরীধামের ইতিহাস
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, শ্রীশ্রী ঠাকুর নরোত্তম দাস ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন গড়েরহাট পরগণার অন্তর্গত বর্তমান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মাতীরবর্তী গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার এবং মাতা নারায়ণী রাণী। সচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি পার্থিব ভোগবিলাসের পরিবর্তে ধর্মসাধনা ও মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি বৃন্দাবনে গিয়ে বৈষ্ণব সাধক লোকনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দীক্ষা লাভের পর খেতুরীতে ফিরে এসে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর প্রেমভক্তি, মানবপ্রেম ও অহিংসার আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ তাঁর কাছে দীক্ষা নিতে আসতেন।
প্রচলিত বৈষ্ণব ঐতিহ্য অনুযায়ী, ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে তিনি নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন। তাঁর তিরোভাব তিথিকে স্মরণ করেই যুগ যুগ ধরে খেতুরীধামে এ মহোৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে।
প্রেমভক্তি, মানবপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে প্রতিবছর খেতুরীধামে সমবেত হন অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আজও রাজশাহীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বমহিমায় টিকে আছে।