অনিল চন্দ্র রায় :
বাবার বেকারত্ব, সংসারে অভাব-অনটন আর পড়াশোনার খরচ জোগাতে নানা সংগ্রাম সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার যমজ দুই বোন রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে দুজনই অর্জন করেছেন জিপিএ-৫। উপজেলার কলেজ পর্যায়ে তারাই একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী।
রহিমা ও রাবেয়া উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জ্বী গ্রামের বাসিন্দা। তারা রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৪২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র দুজন। আর সেই দুজনই যমজ বোন রহিমা ও রাবেয়া।
অন্যদিকে, রাজারহাট উপজেলার সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখায় তারাই একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী শিক্ষার্থী। তবে মাদরাসা শাখায় আরও দুজন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট দুই মেয়ে রহিমা ও রাবেয়া যমজ। তাদের বাবা মনির হোসেন সরদারের স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থান নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে চলেছে পরিবারটি। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি বাবা-মা। নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে দুই বোনও নিজেদের স্বপ্নপূরণে অবিচল থেকেছেন।
দুই মেয়ের এমন সাফল্যে আনন্দিত মা নাসিমা বেগম। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী বেকার। অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছি। প্রাইভেট শিক্ষকরা দুই বোনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। কলেজের অধ্যক্ষ স্যার ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া মেয়েরা উপবৃত্তিও পেয়েছে। সবার সহযোগিতা না পেলে হয়তো মেয়েদের পক্ষে এত ভালো ফল করা সম্ভব হতো না।’
নিজেদের সাফল্যের পেছনের পরিশ্রমের কথা জানিয়ে রহিমা ও রাবেয়া বলেন, ‘বাবার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই ভালো ফল করার জন্য মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছি। কলেজে যাতায়াত ও খাওয়াদাওয়ার সময়টুকু বাদে দিনের বেশির ভাগ সময়ই পড়াশোনায় কাটিয়েছি। ঘুমানোর সময়ও ছিল সীমিত। এখন আমাদের স্বপ্ন, ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজারহাট উপজেলার কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মানবিক বিভাগ থেকে শুধু এই যমজ দুই বোনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের এ সাফল্যে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। কলেজের পক্ষ থেকে দুজনকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।’
রাজারহাটের সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন জানান, কলেজ শাখায় রহিমা ও রাবেয়া এই দুই বোনসহ মোট চারজন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বাকি দুজন মাদরাসা শাখার শিক্ষার্থী।
অভাব-অনটনের সংসারে নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে দুই বোনের এই সাফল্য শুধু তাঁদের পরিবারের মুখেই হাসি ফোটায়নি, বরং এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্যও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার গল্প।