অনিল চন্দ্র রায় :
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বারোমাসিয়া (বাণিদাহ) নদীর ওপর নির্মিত বাঁশের সাঁকো ভেঙে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুই পাড়ের আট গ্রামের হাজারো মানুষ। প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ সাঁকোটির অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর দুই থেকে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ বুকসমান পানিতে নেমে, কেউ সাঁতরে আবার কেউ ভাঙা সাঁকোর ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার হচ্ছেন।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্করা। প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষ থেকে শুরু করে কৃষক ও ব্যবসায়ীদেরও পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সাঁকোটি সংস্কার অথবা নতুন করে নির্মাণ করা হোক।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী এলাকার নবিউলের ঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বারোমাসিয়া (বাণিদাহ) নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ বাঁশের সাঁকোটির দক্ষিণ পাশের মাঝামাঝি প্রায় ১৫০ ফুট অংশ ভেঙে পড়ে আছে। সাঁকোর ওপর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের কোনো উপায় নেই। কেউ পানিতে নেমে নদী পার হচ্ছেন, কেউ সাঁতরে যাচ্ছেন অন্য পাড়ে। আবার কেউ ভাঙা অংশের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় চার দশক আগে এ নদী পারাপারে ছোট ডিঙি ও মাঝারি নৌকাই ছিল মানুষের একমাত্র ভরসা। করিমের ঘাট ও নবিউলের ঘাটে ইজারাদারের মাধ্যমে নৌকায় পারাপার হতেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা। পরবর্তী সময়ে নদীর প্রশস্ততা কমে এলে স্থানীয়দের উদ্যোগে নির্মাণ করা হয় বাঁশের সাঁকো। প্রায় দেড় যুগ ধরে এই সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করছেন।
স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিবছর বর্ষার আগে সাঁকোটি মেরামত করা হলেও দীর্ঘদিন যথাযথ সংস্কার না করায় এর বাঁশের পাটাতন ও কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুই থেকে তিন মাস আগে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। এরপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছেন দুই পাড়ের মানুষ।
সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী, চরগোরকমন্ডল, ঝাউকুটি, পশ্চিম ফুলমতি, নাওডাঙ্গা ও শিমুলবাড়ী এলাকার হকবাজারসহ লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরখারুয়া ও খারুয়া গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
নদী পারাপারের সময় মাথায় বাদামের বোঝা নিয়ে বুকসমান পানিতে নামতে দেখা যায় স্থানীয় বাসিন্দা মিনতি রানীকে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘খালি ছবি তোলেন বাহে। দুই-তিন মাস ধরে এত কষ্ট করে নদী পারাপার হচ্ছি, কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেননি। ছেলেমেয়েদেরও অনেক কষ্ট করে নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। আমরা আর এ দুর্ভোগ সহ্য করতে পারছি না। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত করা হোক।’
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী আকাশ মাহমুদ ও কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, এ পথ দিয়ে প্রতিদিন এলাকার হাজারো মানুষ নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট বাজারে যাতায়াত করেন। পাশাপাশি দেড় থেকে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বালারহাট আদর্শ স্কুল, বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ফুলবাড়ী কলেজে পড়াশোনা করে। সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় তাদের প্রতিদিন চরম কষ্ট করে নদী পার হতে হচ্ছে। দ্রুত মেরামত করা না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, শাকিব ও সবুজ মিয়া এবং কলেজশিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার ও মঈনুদ্দিন জানায়, সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে তাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় কখনো সাঁতরে, আবার কখনো ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা সাঁকো পার হতে হয়। পারাপারের সময় অনেকেই পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। দ্রুত সাঁকোটি মেরামতের দাবি জানায় তারা।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় মৎস্য খামারি আতাউর রহমান রতন বলেন, বারোমাসিয়া (বাণিদাহ) নদীর ওপর নির্মিত সাঁকোটি দুই পাড়ের হাজারো মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। এটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। তাই দ্রুত সাঁকোটি মেরামত অথবা টেকসইভাবে নতুন একটি সাঁকো নির্মাণ করা জরুরি।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী জানান, ভেঙে যাওয়া সাঁকোটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। সাঁকোটি নির্মাণ করা হলে দুই পাড়ের হাজারো মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ হাসান বলেন, সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে একটি টেকসই বাঁশের সাঁকো নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।