প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট থেকে :
সরকারি ডাকঘর, অথচ নেই নিজস্ব ঘর। কোথাও পোস্টমাস্টারের বাড়ির একটি কক্ষে, আবার কোথাও কর্মীদের নিজেদের টাকায় ভাড়া নেওয়া ঘরে চলছে ডাক বিভাগের কার্যক্রম। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার অধিকাংশ শাখা পোস্ট অফিস। অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি রয়েছে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের অভাব, স্বল্প বেতন এবং ডাকসেবা নিয়ে নানা অভিযোগ।
উপজেলার ৯টি শাখা পোস্ট অফিসের মধ্যে ৮টিরই নিজস্ব ভবন নেই। একমাত্র সিঙ্গারডাবরি শাখা পোস্ট অফিস রয়েছে নিজস্ব ভবনে। অন্যদিকে উপজেলা ডাকঘরের নিজস্ব ভবন থাকলেও সেটিও দীর্ঘদিনের অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি এই সেবাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে।
সরেজমিনে বিভিন্ন শাখার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে ঘর ভাড়া নিয়ে ডাকঘর চালাচ্ছেন, আবার কোথাও নিজেদের বসতবাড়ির একটি কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোনো কোনো শাখার ভবন ঝড়ে ভেঙে যাওয়ার পর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও নতুন ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা হয়নি।
উপজেলা ডাকঘর সূত্রে জানা গেছে, রাজারহাটে একটি উপজেলা ডাকঘর, একটি সাব পোস্ট অফিস এবং ৯টি শাখা পোস্ট অফিস রয়েছে। শাখাগুলো হলো—বৈদ্যেরবাজার, মীরের বাড়ি, ঘড়িয়ালডাঙ্গা, রতিগ্রাম, সিঙ্গারডাবরি, সিন্দুরমতি, ডাংরারহাট, নীলেরকুটি ও জোড়সয়রা। এর মধ্যে সিঙ্গারডাবরি ছাড়া বাকি আটটি শাখার নিজস্ব ভবন নেই। নাজিমখান সাব পোস্ট অফিসও চলছে ভাড়া করা ভবনে।
জোড়সয়রা শাখা পোস্ট অফিসের ইডিডিএ মোজাফফর হোসেন জানান, তিনজন কর্মী মিলে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে ডাকঘরের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এজন্য প্রত্যেকে মাসে ১০০ টাকা করে মোট ৩০০ টাকা ভাড়া দেন। অফিসের প্রায় সাত হাজার টাকার আসবাবপত্রও নিজেদের অর্থে কিনেছেন তারা।
তিনি বলেন, “চিঠি ও ব্যাংক লোনের চিঠি খুব আসে। আমরা সব সময় বিলি করার সময় পাই না। আমাদের প্রতিমাসে মাত্র ৪ হাজার ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়।”
তবে এই শাখার সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদুর রহমান। তার অভিযোগ, পোস্ট অফিসটি নিয়মিত খোলা থাকে না। কোনো কোনো দিন সকাল ৯টার দিকে খুললেও ১০টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। কর্মীদের সবাই প্রতিদিন উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডাংরারহাট শাখা পোস্ট অফিসের ইডিএ জ্যোসনা আক্তারের অভিজ্ঞতাও একই। আগে বাজারের একটি ভাড়া করা ঘরে চলত পোস্ট অফিস। মাসে ৬০০ টাকা ভাড়া কর্মীদের নিজেদেরই বহন করতে হতো। পরে নানা সমস্যার কারণে প্রায় তিন বছর ধরে নিজের বাড়িতে ডাকঘরের কার্যক্রম চালাচ্ছেন তিনি।
জ্যোসনা আক্তার বলেন, “সিমেন্টের দোকানের পাশে অফিস ছিল। প্রতিদিন ট্রাক আসা-যাওয়া করত। তাই বাড়িতে পোস্ট অফিস করেছি। আমার শ্বশুর ৩ শতাংশ জমি দিয়েছেন। কিন্তু অফিসের জন্য কোনো বাজেট হয়নি।”
এ শাখায় তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন মো. পেয়ারুল ইসলাম ও লিয়াকত আলী।
অবকাঠামোগত সংকটের আরও দীর্ঘ চিত্র পাওয়া যায় আরেকটি শাখা পোস্ট অফিসের ইডিডিএ আবু হানিফের কথায়। তিনি জানান, ঝড়ে তাদের পোস্ট অফিসের ঘর ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় ১২ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নতুন ভবন নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে নিজের বাড়িতেই ডাকঘরের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি।
আবু হানিফ বলেন, “শুরুতে ৩ শতক জমি সরকারের নামে দেওয়া হয়েছিল। ঘরও নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ঝড়ে ঘর ভেঙে যাওয়ার পর আর নতুন করে ঘর করা হয়নি। প্রায় ১২ বছর ধরে নিজেদের বাড়িতেই অফিসের কাজ করছি।”
তিনি আরও জানান, চাকরিতে যোগদানের সময় মাসিক বেতন ছিল ৩০০ টাকা। ধাপে ধাপে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৩৪০ টাকা হয়েছে। গ্রাম থেকে এখন চিঠি পাঠানোর সংখ্যা কমে গেছে। শহর থেকে গ্রামে আসা চিঠিই মূলত তাদের বিলি করতে হয়।
রাজারহাট উপজেলা ডাকঘরে পোস্টমাস্টার সুরভী শারমিন, পোস্ট অপারেটর জোবাইদুল ইসলাম, পোস্টম্যান নুরুল ইসলাম ও পেকার রফিকুল ইসলাম কর্মরত রয়েছেন। নাজিমখান সাব পোস্ট অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন পোস্টমাস্টার আনোয়ারুল ইসলাম ও একজন পোস্টম্যান।
শাখা পোস্ট অফিসগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা পোস্টমাস্টার সুরভী শারমিন বলেন, “আমার দায়িত্ব শুধু হিসাব গ্রহণ করা। এর বাইরে শাখা অফিস সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় শাখা পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠার জন্য এলাকার মানুষ জমি দিয়েছিলেন। কোথাও ডাক বিভাগের কর্মীরাই নিজেদের অর্থ ব্যয় করে ঘর নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেসব ঘর নষ্ট হয়ে গেলেও নতুন ভবন নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এখন ব্যক্তিগত বাড়ি ও ভাড়া করা কক্ষনির্ভর হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির প্রসারে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের প্রচলিত মাধ্যম হিসেবে ডাকঘরের ব্যবহার কমেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের জনপ্রিয়তা বাড়ায় মানুষ এখন দ্রুত যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম বেছে নিচ্ছেন। তবে সরকারি চিঠিপত্র, ব্যাংকের নথি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পৌঁছে দিতে ডাক বিভাগের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও ডাক বিলিতে ধীরগতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘরের পোস্ট অফিস পরিদর্শক ও রাজারহাট উপজেলার শাখা পোস্ট অফিসের পরিদর্শক মোকলেছুর রহমান বলেন, শাখা অফিসের ইডিএ, ইডিডিএ ও ইডিএমসি পদে কর্মরত ব্যক্তিরা সংস্থাপন শাখার মাধ্যমে মাসে প্রায় চার হাজার টাকা ভাতা পান। কোনো শাখায় একজন, কোথাও দুজন, আবার কোথাও তিনজন কর্মী রয়েছেন। কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজারহাটের ডাকঘরগুলোকে শুধু নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, কার্যকর সরকারি সেবাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য ভবনহীন আটটি শাখায় নিজস্ব ভবন নির্মাণ, উপজেলা ডাকঘরের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ এবং কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত ডাকসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকির দাবি জানিয়েছেন তারা।