লালমনিরহাটে ছয় ফুটের ব্যবধানে মন্দির-মসজিদ, ৮৩ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত
ধরলা পোস্ট |
প্রতিবেদক:
DharlaPost
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ
ছবি-ধরলা পোস্ট
অনিল চন্দ্র রায়, লালমনিরহাট থেকে ফিরে :
একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মন্দির ও মসজিদ। দুই উপাসনালয়ের দূরত্ব মাত্র ছয় ফুট। একদিকে মন্দিরে পূজার ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের বাদ্য, অন্যদিকে মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি। ধর্মীয় উপাসনার ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। এভাবেই ৮৩ বছর ধরে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকার মন্দির-মসজিদ।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালী মন্দিরে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য ভক্ত। পূজার আনুষ্ঠানিকতা, ঢাকের শব্দ আর মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে মন্দিরের আঙিনা। এর ঠিক পাশেই জামে মসজিদে নির্বিঘ্নে আদায় হচ্ছে নামাজ। নামাজের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র। দুই ধর্মের মানুষের এই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধাবোধই দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখেছে।
শুক্রবার রাতে কালীবাড়ী দুর্গা মন্দির পরিদর্শন করেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রায় ৮৩ বছর ধরে একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি রয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শুধু লালমনিরহাটের নয়, সারা বাংলাদেশের।
তিনি আরও বলেন, একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদের অবস্থান লালমনিরহাটকে সারা দেশে পরিচিত করেছে। এই সম্প্রীতি যেন অনন্তকাল অটুট থাকে, সে জন্য সবাইকে মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কালীবাড়ী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩৮ সালে। এর প্রায় ১০৫ বছর পর ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদটি। সেই হিসাবে ৮৩ বছর ধরে একই আঙিনায় পাশাপাশি অবস্থান করছে দুই ধর্মীয় উপাসনালয়।
জানা গেছে, মন্দিরের জমির পরিমাণ আট শতাংশ এবং মসজিদের জমি পাঁচ শতাংশ। মাঝখানের প্রায় ১২ শতাংশ জমির মালিক অন্য একজন। তবে মন্দির ও মসজিদ কমিটির সদস্যদের ভাষ্য, ওই জমির মালিক কখনো আঙিনাটি দখলে নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি।
স্থানীয়দের কাছে এই আঙিনা কেবল দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক। সম্প্রীতির এই দৃষ্টান্ত দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। তাঁরা মন্দির ও মসজিদ ঘুরে দেখেন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের গল্প শোনেন।
টাঙ্গাইল থেকে আসা দর্শনার্থী আ ফ ম জাহিদুর রহমান (৬৫) বলেন, একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। কয়েক যুগ ধরে এখানে কোনো বিরোধ না হওয়া মানবতার চিরন্তন শিক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত।
পাবনা থেকে আসা দর্শনার্থী সুব্রত চক্রবর্তী (৭০) জানান, তিনি কয়েকবার এই মন্দির ও মসজিদ পরিদর্শন করেছেন। সুযোগ পেলেই দুর্গাপূজার সময় এখানে ছুটে আসেন। গত বছরও এসেছিলেন, এবারও এসেছেন। লালমনিরহাটে এক আত্মীয়ের সুবাদে তাঁর এখানে আসা। প্রতিবারই জায়গাটি তাঁকে নতুন করে সম্প্রীতি ও শান্তির কথা মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, ‘এখানে এলে খুব ভালো লাগে। চিত্তটা নির্মল হয়ে যায়।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার বলেন, ৮৩ বছর ধরে একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদের সহাবস্থান সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ফুট দূরত্বে দুটি উপাসনালয় পাশাপাশি থাকার দৃশ্য তিনি প্রথমবার নিজের চোখে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘পূজার সময় মন্দির কমিটির লোকজন আরাধনা করছেন, আর নামাজের সময় মুসলিম ভাইয়েরা নামাজ আদায় করছেন। এমন দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। এই সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত শুধু লালমনিরহাটে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই কামনা করি।’
মসজিদের ইমাম মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে চলি। কোনো দিন কথা-কাটাকাটিও হয়নি। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন, সম্প্রীতির গল্প শুনে যান।’
মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধই দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের ভিত্তি। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেনি; বরং একে অপরের প্রতি সম্মান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।
কালীবাড়ী মন্দির কমিটির সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, ‘নামাজের সময় আমরা বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখি। পূজা চলাকালে মুসলিম প্রতিবেশীরাও আমাদের সহযোগিতা করেন।’
দুর্গাপূজার সময় বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগমে মন্দিরের আঙিনা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে জানিয়ে তিনি বলেন, এ সময়ও মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিদের কাছ থেকে কখনো বিরক্তি বা অসহযোগিতার কথা শোনেননি তাঁরা। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই ধর্মীয় উৎসব ও উপাসনা পরিচালিত হয়ে আসছে।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে পূজা করতে পারেন, সে জন্য আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। এটি শুধু লালমনিরহাট নয়, সারা দেশের জন্যই ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্গাপূজার সময় এখানে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, বহু বছর ধরে এখানে কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি নিজেও নিয়মিত মন্দিরের নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদের অবস্থান মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম পালনের অধিকার সবার। সেই অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর মধ্য দিয়েই শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে। মত ও বিশ্বাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার চর্চা যে দীর্ঘস্থায়ী সম্প্রীতির ভিত্তি হতে পারে, এই আঙিনা তারই দৃষ্টান্ত।
তিনি আরও বলেন, মন্দিরে পূজা করতে আসা ভক্তরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা যে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতেই হবে, এমন নয়—লালমনিরহাটের কালীবাড়ীর এই মন্দির-মসজিদ তার বাস্তব উদাহরণ। মাত্র ছয় ফুটের ব্যবধানের দুই উপাসনালয় আর ৮৩ বছরের সম্প্রীতির ইতিহাস যেন নীরবে বলে যায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা থাকলে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষও পাশাপাশি থেকে শান্তিতে বসবাস করতে পারেন।