advertisement
advertisement

বিশ্ব নাথের জলে ও দাঙ্গায় সংগ্রাম


ধরলা পোস্ট | প্রতিবেদক: DharlaPost প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৫৭ অপরাহ্ণ
বিশ্ব নাথের জলে ও দাঙ্গায় সংগ্রাম

ধরলা পোস্ট

advertisement
অনিল চন্দ্র রায়: 
কুড়িগ্রামের সীমান্তঘেঁষা ফুলবাড়ী উপজেলার নদী-নালা ও খাল-বিলে মাছ শিকার করে অতিকষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছেন কয়েক শ জেলে পরিবারের সদস্যরা।
ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে জাল টেনেও মিলছে না পর্যাপ্ত মাছ। দিনভর মাছ শিকার করে জনপ্রতি আয় হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন পোশাক কেনা কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভালো খাবার খাওয়ার স্বপ্নও অধরা থেকে যাচ্ছে অনেকের।
উপজেলার নাওডাঙা, বড়ভিটা, ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন গিয়ে দেখা গেছে,  চারদিকে যখন দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, তখন ধরলা ও বারোমাসিয়া নদীর পাড়ে বসবাসরত এসব জেলের দিন কাটছে জীবিকার সন্ধানে। 
উৎসবের আনন্দের চেয়ে তাঁদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে দুবেলা খাবার জোগাড়ের চিন্তা। পূজার দিনেও জাল হাতে নদীতে নামতে হবে, মাছ ধরতে হবে, আর সেই মাছ বিক্রির টাকায় চালাতে হবে সংসার।
এদিকে পূজার উৎসব ঘনিয়ে এলেও জীবিকার অনিশ্চয়তা আর আর্থিক সংকটে জর্জরিত জেলে পরিবারগুলোর কাছে আনন্দের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সংসার চালানোর সংগ্রাম। 
তাঁদের ভাষ্যমতে, উৎসবের এই সময়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে অন্তত পূজার দিনগুলোতে পরিবারের সদস্যদের মুখে কিছুটা হাসি ফোটে।
সম্প্রতি ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা নদীতে মাছ শিকারের সময় কথা হয় সদর ইউনিয়নের কুটিচন্দ্রখানা গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বনাথ বিশ্বাসের (৭৫) সঙ্গে।

দুর্গাপূজার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, গরিব মানুষের আবার পূজার আনন্দ আছে বাহে! সংসারই চালাতে পারছি না। দুই বেলা খাবার জোটানো যেখানে কঠিন, সেখানে পূজার নতুন কাপড়চোপড় কিনব কী দিয়ে? টাকা পাব কোথায় ?
নদীর দিকে ইশারা করে বিশ্বনাথ বলেন, দেখতেছেন না, আমরা চারজন সকাল থেকে নদীর এপার-ওপার জাল টেনে আড়াই থেকে তিন কেজি মাছ পেয়েছি। এসব মাছ প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। এখন বলেন, চারজনের ভাগে কত টাকা পড়ে? এর মধ্যে নৌকার ভাড়াও দিতে হয়।
বয়সের ভার আর নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নদীতে মাছ ধরছেন বিশ্বনাথ। স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাঁর সংসার। কৃষিকাজে কাজ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে রোদে পুড়ে সারাদিন নদীতে মাছ ধরেন। অনেক সময় দুপুরের খাবারও জোটে না। মাছ বিক্রির সামান্য টাকা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতে হয় তাঁকে। পূজায় ভালো খাবার খাওয়া ও নতুন পোশাক পরার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সংকটে তা পূরণ হওয়ার আশা দেখছেন না তিনি।

একই এলাকার কৃষ্ণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমরা চারজন সকাল ৯টার দিকে মাছ ধরতে বের হয়েছি। দুপুরের খাবারও অনেক সময় জোটে না। সারাদিন নদীতে মাছ ধরে আড়াই থেকে তিন কেজি দেশি মাছ পাই। কোনো দিন দুই কেজি, আবার কোনো দিন চার কেজির মতো পাওয়া যায়। এই মাছ বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয়।
দুর্গাপূজার আনন্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “পূজার আনন্দ ধনীদের। আমাদের মতো গরিব জেলেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। সেখানে পূজার আনন্দ-উৎসব আমাদের ভাগ্যে জোটে না বাহে।
একই দলের জেলে চন্দ্রখানা এলাকার আমিনুল ইসলাম (৫০) জানান, পাঁচ-ছয় বছর ধরে তাঁরা একসঙ্গে মাছ শিকার করছেন। মাছ ধরাই তাঁদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সংসারের খরচ মেটাতে পূজার সময়ও মাছ ধরা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। উৎসবের দিনগুলোতেও জীবিকার তাগিদে নদীতে নামতে হয় তাঁদের।
গোরকমন্ডলের জেলেপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবার
ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকমন্ডল জেলেপাড়ায় বসবাসকারী দুই শতাধিক পরিবারের জীবিকা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি পরিবার অসহায়। কোনো কোনো পরিবার চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
জেলে আয়চন বিশ্বাস জানান, সারাদিন নৌকা নিয়ে বারোমাসিয়া নদীতে মাছ শিকার করেও কোনো মতে সংসার চালাতে হয় তাঁকে। বছরের পর বছর একই কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন কাটছে তাঁর। পূজার সময়েও পরিবারে উৎসবের আমেজ থাকে না।

তিনি বলেন, পূজাপার্বণেও আমার দিন অন্য দিনের মতোই কাটে। সারাদিন নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে হয়। সংসার চালাতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। পরিবারে পূজার আনন্দ বলতে কিছু থাকে না।

জেলে দ্বিনেশ চন্দ্র বিশ্বাসেরও নিজস্ব জাল নেই। অন্যের জাল বা সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে মাছ শিকার করতে হয় তাঁকে। এতে মাছ ধরার আয় থেকে পুরো অর্থ নিজের হাতে থাকে না।

একই এলাকার খগেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস (৭৫) বলেন, “জীবিকা নির্বাহ করাই কঠিন। তার ওপর পূজা উপলক্ষে নতুন কাপড়চোপড় ও ভালো খাবারের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমাদের মতো পরিবারের কাছে সেই স্বপ্ন পূরণ করা কঠিন।

নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতা তপন চন্দ্র বিশ্বাস ও রিপন চন্দ্র বিশ্বাস জানান, শুধু গোরকমন্ডল এলাকাতেই দুই শতাধিক পরিবার মাছ ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত। পুরো ইউনিয়নে জেলে পরিবারের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। তাঁদের মধ্যে শতাধিক পরিবার চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য, নদ-নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় জেলেদের আয় কমেছে। 
ফলে অনেক পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে। আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে এসব অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারি-বেসরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা
ফুলবাড়ী উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক সুকুমার সেন ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বীরেন্দ্র নাথ রায় জানান, তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর মধ্যে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে নতুন পোশাক বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে তা ইতিবাচক হবে বলে মনে করেন তাঁরা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে অসহায় সনাতনী পরিবারগুলোর জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা নেই। তবে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু পরিবারকে সহায়তা করে আসছেন। তবে এ বছর বিতরণ করবো কি না এখনো সিধান্ত নেয়নি। 

ফুলবাড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, উপজেলায় মোট জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ২৯৭টি। এর মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী জেলে পরিবারের সংখ্যা ৫৯০টি।
তিনি বলেন, ফুলবাড়ী ইলিশ জোনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এখানকার জেলেরা ইলিশ আহরণ নিষেধাজ্ঞাকালীন বিশেষ সরকারি সহায়তার বরাদ্দ পান না। কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলা ছাড়া অন্য উপজেলাগুলো ইলিশ জোনের আওতায় রয়েছে। সেসব এলাকার নিবন্ধিত জেলেদের নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) দিলারা আকতার জানান, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে উপজেলার অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই বলে জানিয়েছেন। 

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর