advertisement
advertisement

শুধু আখড়াবাড়িতে নয়, কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা-ধরলা অববাহিকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে লালনচর্চা


ধরলা পোস্ট | প্রতিবেদক: DharlaPost প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১:২৭ অপরাহ্ণ
শুধু আখড়াবাড়িতে নয়, কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা-ধরলা অববাহিকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে লালনচর্চা

ছবি- ধরলা পোস্ট

advertisement
দীপক কুমার রায়, ধরলা পোস্ট : 
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি লালনচর্চার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র। তবে সেই চর্চা এখন আর নির্দিষ্ট কোনো জনপদে সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীবিধৌত কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কলেজপাড়ায় ‘মায়ের তরী’র ‘শান্তনালয় গুরুগৃহ’ হয়ে উঠেছে লালনচর্চার এমনই এক নীরব আশ্রয়। 
সেখানে শিশুদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে লালনের গান, গানের সুরে ছড়িয়ে পড়ছে মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী।
পহেলা কার্তিক মহাত্মা ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। এ উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করা হচ্ছে লালন স্মরণোৎসব। এমন এক সময়ে কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত জনপদে শিশুদের মধ্যে লালনসংগীত ও তাঁর মানবিক দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
নাগেশ্বরীর কলেজপাড়ার শান্তনালয় গুরুগৃহে বসে মনোযোগ দিয়ে লালনের গান শিখছিল ছিদরাতুল মুনতাহা মুন, সামিউল ইসলাম শানী, দিবা মনি সরকার, তন্ময় মোহন্ত তীর্থ ও পূজা মনি রায়। তাদের কাছে লালনের গান কেবল সুর আর কথার সমন্বয় নয়; বরং মানুষকে চেনা, মানুষকে ভালোবাসা এবং ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে আপন করে নেওয়ার শিক্ষাও।
‘মায়ের তরী’র প্রধানতম গুরু নারায়ণ চন্দ্র রায় বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও আধুনিক বিনোদনের বিভিন্ন মাধ্যমে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।
 এ অবস্থায় তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে লালন, বাউল ও লোকগানের নিয়মিত চর্চা প্রয়োজন। গানের কথা ও অন্তর্নিহিত ভাব বুঝিয়ে শেখানো গেলে শিশুরা শুধু ভালো শিল্পীই নয়, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠবে। ‘মায়ের তরী’ সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
সংগঠনটির সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, লালনকে শুধু কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর দর্শনের ব্যাপ্তি পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলার পাড়ের শিশুরাও লালনের দর্শন ও সংগীতের উত্তরাধিকার বহন করতে পারে। তাদের কণ্ঠে লালনের গান তুলে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। লোকসংগীতের চর্চার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও ‘মায়ের তরী’র অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পারবে।
মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ জানান, লোকসংগীতের সংরক্ষণ ও প্রসারে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে একটি লোকসংগীত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা এবং প্রবীণ সাংস্কৃতিকসেবীদের জন্য আশ্রয়স্থল নির্মাণ। হারিয়ে যেতে বসা লোকগান, বাদ্যযন্ত্র, শিল্পী ও তাঁদের জীবনকথা সংগ্রহ করে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি জীবনের শেষ প্রান্তে অসহায় হয়ে পড়া প্রবীণ লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিকসেবীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে চায় সংগঠনটি।
কুড়িগ্রাম লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক শিবলী সাদিক আতিক বলেন, লালনের গান কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি বাংলার মানুষের মানবিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ধারক। কুড়িগ্রামের মতো সীমান্তবর্তী ও নদীভাঙনপ্রবণ জনপদে শিশুদের মধ্যে লালনচর্চা ছড়িয়ে পড়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিকতা, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটতে পারে।

লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের প্রাক্কালে ‘মায়ের তরী’র নয়টি গুরুগৃহ যেন সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিচ্ছে—লালনচর্চা কেবল ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে পড়তে পারে নদীঘেরা জনপদের প্রত্যন্ত গ্রামেও। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলার পাড়ের শিশুদের কণ্ঠে লালনের গান বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। গানের সুরের সঙ্গে তাঁর মানবিক দর্শনও যদি নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তবে সেটিই হবে লালনচর্চার প্রকৃত বিস্তার।
advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর