৪০০টির বেশি বিয়ে দিয়েছেন রংপুরের এশরা বেগম, বদলে যাচ্ছে ঘটকালির চিত্র
ধরলা পোস্ট |
প্রতিবেদক:
DharlaPost
প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর ২০২৬, ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
ছবি সংগৃহীত
ধরলা পোস্ট ডেস্ক
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার এশরা বেগম। প্রায় ২৮ বছর ধরে ঘটকালির পেশায় যুক্ত তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে পাত্র-পাত্রী খুঁজে দিয়ে চার শতাধিক বিয়ে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করেছেন। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩০টি বিয়েও রয়েছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে আগের মতো কদর নেই এই পেশার।
প্রতিদিন পাত্র-পাত্রীদের জীবনবৃত্তান্ত সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন এশরা। তারাগঞ্জের ইকরচালী হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের সম্বন্ধ তৈরি করেন। কখনো পাত্রের সন্ধান করেন, আবার কখনো পাত্রী খুঁজে দেন। দুই পক্ষের পছন্দ মিললে দেখাদেখির ব্যবস্থাও করেন।
১৯৯৬ সালের দিকে আত্মীয় নজরুল ইসলামের মাধ্যমে ঘটকালির কাজে যুক্ত হন এশরা। প্রথমবার রংপুরের মাহিগঞ্জের এক কাপড় ব্যবসায়ীর জন্য পাত্রী খুঁজে দেন। সেই সম্বন্ধ সফল হওয়ার পর নিয়মিতভাবে এ পেশায় কাজ শুরু করেন তিনি। শুরুতে কয়েকটি সম্বন্ধ ব্যর্থ হলেও ধীরে ধীরে এলাকায় পরিচিতি বাড়তে থাকে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক পরিবারের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এমনও হয়েছে, যে পরিবারের মা-বাবার বিয়ের সম্বন্ধ তিনি করিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে তাঁদের সন্তানদের বিয়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর পড়েছে।
এশরার ভাষ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে মানুষের পছন্দ ও চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। আগে পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্ব পেত। বর্তমানে পাত্র-পাত্রীদের নিজস্ব মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিবেচনা করা হয়।
এখন পাত্রের চাকরি, কর্মসংস্থান, আর্থিক অবস্থা ও পারিবারিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেন অনেক পরিবার। ফলে দুই পক্ষের চাহিদা মেলাতে ঘটকদের আগের তুলনায় বেশি সময় ও পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
তবে এই পেশায় নানা বিড়ম্বনার মুখেও পড়তে হয় এশরাকে। অনেক সময় দুই পক্ষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তারা নিজেরাই যোগাযোগ করে বিয়ের আয়োজন করেন। এতে ঘটক হিসেবে তাঁর সম্মানী পাওয়া হয় না। কখনো কখনো যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
২০২২ সালে এমন একটি ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে বিয়ের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর পরে তাঁরা নিজেরাই বিয়ে করেন। এতে এশরার প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হলেও তিনি কোনো পারিশ্রমিক পাননি।
এ ছাড়া ফেসবুক, মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে বিয়ের সম্বন্ধ খোঁজার পদ্ধতিও বদলে গেছে। প্রেমের বিয়ে এবং পরিবারের সরাসরি যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় ঘটকদের প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে।
এশরা জানান, বর্তমানে ঘটকালি করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসে এক-দুটি বিয়ের সম্বন্ধ সফল করাও কঠিন। একটি বিয়ে সম্পন্ন করাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও এর পেছনে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। আবার পাত্র-পাত্রী দেখানোর জন্য কেউ কেউ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দেন।
তবুও পেশাটির প্রতি ভালোবাসা কমেনি এশরা বেগমের। মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়ার আনন্দ থেকেই এখনো এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে যেতে চান এই নারী ঘটক।