কুড়িগ্রামে সালিশের পর ভুক্তভোগী নারীর ‘আত্মহত্যা’ অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি, ধরলা পোস্ট: কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় রেল পুলিশের ভুয়া পরিচয় দিয়ে এক স্বামী পরিত্যক্তা তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে স্বর্ণালংকার ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক বসলেও অভিযুক্তকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে নাজমা (২৬) নামের ওই তরুণী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহত নাজমা উলিপুর উপজেলার পশ্চিম নাওড়া এলাকার আব্দুল খালেকের মেয়ে।
নাজমার স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পশ্চিম নাওড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমার সঙ্গে সাইদুর রহমান পলাশ পরিচয়ে এক ব্যক্তির পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ব্যক্তি নিজেকে রেল পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে নাজমার কাছ থেকে কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পলাশ নাজমার সঙ্গে দেখা করতে পশ্চিম নাওড়া এলাকায় যান। তবে তাঁর চলাফেরা ও কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় স্থানীয় লোকজন দুজনকে আটক করে রাখেন। ওই রাতেই স্থানীয়দের উদ্যোগে তাদের দুজনের সম্মতিতে বিয়ের আয়োজন করা হয়। কিন্তু বিয়ের নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে। পরে জানা যায়, পলাশ পরিচয়ে প্রতারণা করা ওই ব্যক্তির আসল নাম দুলাল চন্দ্র (৫৩), যিনি উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের খোঁচাবাড়ি এলাকার অমল চন্দ্রের ছেলে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর বিয়ের আয়োজন পণ্ড হয়ে যায় এবং তাঁকে রাতভর আটকে রাখা হয়।
পরবর্তীতে গত শনিবার রাতে উলিপুর পৌর শহরের একটি স্থানে বিষয়টি নিয়ে গোপন সালিশ বৈঠক বসে বলে জানান স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষ্যমতে, ওই বৈঠকে ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সফি কামাল এবং পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, যাঁরা দুলাল চন্দ্রকে আটকে রেখেছিলেন, তাঁদের না জানিয়েই মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে অভিযুক্ত দুলাল চন্দ্রকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, প্রেমের সম্পর্ক ও প্রতারণার এই পুরো ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিকভাবে চরম হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার অপমান ও মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে নাজমা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। রবিবার দুপুরে বাড়ির গোয়ালঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এদিকে সালিশ বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম দাবি করেন, “বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় উভয়পক্ষের স্বজনদের নিয়ে তা সামাজিকভাবে মীমাংসা করা হয়। বৈঠকে ক্ষতিগ্রস্তপক্ষকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং উপস্থিত সবার সামনে নাজমার স্বজনদের হাতে ওই টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।” তবে এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের ভাইয়ের পক্ষ থেকে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনগত পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
এই নিউজ সাইটটি মোবাইলে অ্যাপের মতো ইনস্টল করে দ্রুত ব্যবহার করুন।