স্বামীর মৃ/ত্যুর পর নিঃসঙ্গ অরেচা, স্মৃতির ঘরে কাটে একাকী জীবন
ধরলা পোস্ট |
প্রতিবেদক:
DharlaPost
প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ৪:০১ অপরাহ্ণ
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও ধরলা পোস্ট :
ঘর আছে, আছে সাজানো সংসারের স্মৃতি, শুধু নেই জীবনসঙ্গী। যে মানুষটির সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে দীর্ঘ ১৫ বছর কাটিয়েছেন, সেই মানুষটি আজ আর নেই। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে একাকিত্বই যেন অরেচার নিত্যসঙ্গী। কখনো বাবার বাড়ি, কখনো আশ্রয়দাতার পরিবারের কাছে থেকে কাটছে তাঁর দিন। স্বামী হারানোর শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতার কষ্ট বুকে নিয়ে দিন পার করছেন খর্বাকৃতির নারী অরেচা।
প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর গ্রাম থেকে কুড়িগ্রামে এসেছিলেন অরেচা। ২০১০ সালে তিন ফুটের কিছু বেশি উচ্চতার অরেচার সঙ্গে বিয়ে হয় প্রায় তিন ফুট উচ্চতার আবদার হোসেনের। এরপর শুরু হয় তাঁদের দাম্পত্য জীবন। অভাব-অনটন থাকলেও একে অপরকে নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন তাঁরা। ভিক্ষাবৃত্তি, কখনো দিনমজুরি করে চলত তাঁদের সংসার। সন্তান-সন্ততি না থাকলেও পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে ছিলেন এই দম্পতি।
জানা যায়, প্রায় ৩৬ বছর আগে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়ন থেকে কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নে আসেন আবদার হোসেন। সহায়-সম্বল না থাকায় আশ্রয় নেন কাজী মিজানুর রহমানের বাড়িতে। সেখানে দীর্ঘদিন কৃষিকাজ করেছেন। এমনকি হালচাষ করেও জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
জীবনের শুরুতে দুবার বিয়ে করলেও কোনো সংসারই টেকেনি আবদারের। প্রথম স্ত্রী রেজিয়ার সঙ্গে দুই বছর সংসার করার পর বিচ্ছেদ হয়। এরপর আরজিনাকে বিয়ে করলেও দুই মাসের মাথায় সেই সংসার ভেঙে যায়। খর্বাকৃতির মানুষ হওয়ায় স্ত্রীরা তাঁর সঙ্গে সংসার করতে চাননি বলে এলাকায় আলোচনা ছিল। পরে ২০১০ সালে তৃতীয়বারের মতো অরেচাকে বিয়ে করেন তিনি।
অভাবের সংসারে নিত্যদিনের সংগ্রামের পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতাও তাঁদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। অসুস্থতার কারণে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে বের হতে পারতেন না তাঁরা। ছিল না নিজস্ব জমি কিংবা ঘরবাড়ি। এ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আশ্রয়দাতা পরিবারের জমিতে তাঁদের জন্য নির্মাণ করে দেওয়া হয় একটি ঘর। জীবিকা নির্বাহের জন্য দেওয়া হয় একটি অটোরিকশাও। সেই ছোট্ট ঘরটিই হয়ে উঠেছিল তাঁদের সুখ-দুঃখের ঠিকানা।
কিন্তু বছরখানেক আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান আবদার হোসেন। মুহূর্তেই বদলে যায় অরেচার জীবন। যে ঘরে দুজনের হাসি-আনন্দে সময় কাটত, সেই ঘরই এখন তাঁর কাছে নিঃসঙ্গতার প্রতীক।
স্বামীর মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত অরেচা বলেন, ‘সকালে মানুষটা সুস্থ ছিলেন। হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হয়। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। কিন্তু রাতেই মানুষটা চলে গেলেন। যার স্বামী-সন্তান কেউ নেই, একা থাকার কষ্ট সেই-ই বোঝে।’
স্বামীর মৃত্যুর পর একা ঘরে থাকতে পারেন না অরেচা। তাই বেশির ভাগ সময় বাবার বাড়িতে অথবা আশ্রয়দাতা পরিবারের সদস্যদের কাছে থাকেন। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত ঘরে ফিরে এলেও সেখানে আগের মতো আর কোনো সঙ্গী নেই।
আশ্রয়দাতা মরহুম কাজী মিজানুর রহমানের ছেলে কাজী আলমগীর হোসেন বাবু বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে অরেচা প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। একা থাকতে পারেন না। কখনো বাবার বাড়িতে, আবার কখনো আমার মায়ের কাছে থাকেন।’
একসময় অভাবের সংসারেও দুজনের ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল অরেচার পৃথিবী। আজ সেই সংসার আছে, আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই; নেই শুধু পাশে থাকার মানুষটি। স্বামীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ জীবনের প্রতিটি দিন যেন তাঁর কাছে দীর্ঘ অপেক্ষার নাম।